Blog Details

Blog Image

ব্যাংক ও বীমা: অর্থনীতির দুই স্তম্ভ

বাংলাদেশের অর্থনীতি নিয়ে আলোচনা হলে সাধারণত ব্যাংকিং খাতই সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব পায়। আমানত সংগ্রহ, ঋণ বিতরণ, ব্যবসা-বাণিজ্যে অর্থায়ন, বিনিয়োগ ও অর্থপ্রবাহ সচল রাখার ক্ষেত্রে ব্যাংকের ভূমিকা অনস্বীকার্য। কিন্তু একটি দেশের অর্থনীতি শুধু অর্থের লেনদেন ও বিনিয়োগের ওপর নির্ভর করে না। অর্থনীতিকে টেকসই ও জনবান্ধব করতে মানুষের স্বাস্থ্যঝুঁকি, মৃত্যুজনিত ঝুঁকি এবং পারিবারিক আর্থিক নিরাপত্তাও নিশ্চিত করা জরুরি। এই দৃষ্টিকোণ থেকে ব্যাংক ও জীবন বীমাকে একটি দেশের আর্থিক ব্যবস্থার দুটি গুরুত্বপূর্ণ স্তম্ভ হিসেবে বিবেচনা করা যায়। সহজভাবে বললে, ব্যাংক অর্থনীতিতে অর্থের প্রবাহ ও বিনিয়োগের অবকাঠামো তৈরি করে, আর জীবন বীমা ব্যক্তি ও পরিবারের আর্থিক ঝুঁকি মোকাবিলার নিরাপত্তাবলয় তৈরি করে। তাই দুটি খাতের সুস্থতা, স্বচ্ছতা ও কার্যকারিতা একটি দেশের সামগ্রিক অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতার জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

ব্যাংকিং খাতের চিত্র: আস্থার বড় পরীক্ষা: বাংলাদেশের ব্যাংকিং খাত বর্তমানে একটি কঠিন সময়ের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। বাংলাদেশ ব্যাংকের সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, জুন ২০২৬ শেষে ব্যাংকিং খাতে খেলাপি বা শ্রেণিকৃত ঋণের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ৬ লাখ ৬ হাজার ৫৫৫ কোটি টাকা, যা মোট ঋণের ৩২ দশমিক ৭৮ শতাংশ। অর্থাৎ ব্যাংকিং খাতের প্রতি ১০০ টাকা ঋণের মধ্যে প্রায় ৩৩ টাকা শ্রেণিকৃত ঋণের আওতায় রয়েছে। এর মাত্র তিন মাস আগে, মার্চ ২০২৬ শেষে খেলাপি ঋণের পরিমাণ ছিল ৫ লাখ ৮৮ হাজার ৭০৪ কোটি টাকা। অর্থাৎ এক প্রান্তিকের ব্যবধানে শ্রেণিকৃত ঋণ বেড়েছে ১৭ হাজার ৮৫১ কোটি টাকা। এই পরিসংখ্যান নিঃসন্দেহে উদ্বেগজনক। কারণ খেলাপি ঋণ শুধু ব্যাংকের হিসাবের একটি সংখ্যা নয়; এর সঙ্গে আমানতকারীর আস্থা, ব্যাংকের তারল্য, নতুন ঋণ বিতরণ, উদ্যোক্তার বিনিয়োগ, কর্মসংস্থান এবং সামগ্রিক অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির সম্পর্ক রয়েছে। বাংলাদেশের ব্যাংকিং ব্যবস্থার আকারও বিপুল। ২০২৬ সালের মে মাসের তথ্য অনুযায়ী, ব্যাংকিং ব্যবস্থায় মোট আমানতের পরিমাণ ছিল প্রায় ২০ লাখ ৪১ হাজার ৬৯৩ কোটি টাকা। একই সময়ে বেসরকারি খাতে ব্যাংক ঋণের পরিমাণ ছিল প্রায় ১৮ লাখ ২৫ হাজার ৪২০ কোটি টাকা। এত বড় একটি আর্থিক ব্যবস্থায় দুর্বলতা দেখা দিলে তার প্রভাব শুধু ব্যাংকের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকার সুযোগ নেই; তা অর্থনীতির বিভিন্ন স্তরে ছড়িয়ে পড়তে পারে।

অর্থপাচারের অভিযোগ: আরও একটি বড় উদ্বেগ: বাংলাদেশের আর্থিক খাতের সংকট নিয়ে আলোচনা করতে গেলে অর্থপাচারের অভিযোগও সামনে আসে। বিভিন্ন সময়ে প্রায় ২ লাখ কোটি টাকা বিদেশে পাচারের অভিযোগ বা হিসাব নিয়ে আলোচনা হয়েছে। কয়েকটি বড় ব্যবসায়িক গোষ্ঠীর মাধ্যমে ব্যাংক থেকে বিপুল অর্থ সরিয়ে নেওয়ার অভিযোগ নিয়েও বিভিন্ন তদন্ত ও প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়েছে। তবে এখানে একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় পরিষ্কার রাখা দরকার। বিদেশে পাচারের অভিযোগে উল্লিখিত অর্থ এবং ব্যাংকিং খাতের খেলাপি ঋণ একই ধরনের পরিসংখ্যান নয়। ফলে ২ লাখ কোটি টাকা অর্থপাচারের হিসাবের সঙ্গে ৬ লাখ ৬ হাজার ৫৫৫ কোটি টাকা খেলাপি ঋণ যোগ করে ৮ লাখ কোটি টাকার বেশি অর্থ “ব্যাংকিং খাত থেকে অবৈধভাবে সরিয়ে নেওয়া হয়েছে” এমন দাবি করা তথ্যগতভাবে সঠিক হবে না। বরং বলা যায়, একদিকে বিপুল খেলাপি ঋণ এবং অন্যদিকে অর্থপাচারের গুরুতর অভিযোগ দুটি বিষয়ই দেশের আর্থিক খাতের সুশাসন ও আস্থার ওপর বড় প্রশ্ন তৈরি করেছে। এই আস্থা ফিরিয়ে আনতে হলে শুধু খেলাপি ঋণ আদায় করলেই হবে না; ঋণ বিতরণ প্রক্রিয়ায় স্বচ্ছতা, ব্যাংক পরিচালনায় জবাবদিহি এবং আর্থিক অপরাধ প্রতিরোধেও কার্যকর ব্যবস্থা নিতে হবে।

জীবন বীমা: অর্থনীতির অন্য নিরাপত্তাবলয়: ব্যাংকিং খাতের পাশাপাশি জীবন বীমা শিল্পের অবস্থাও গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করা প্রয়োজন। বাংলাদেশে বর্তমানে ৩৬টি জীবন বীমা কোম্পানি এবং ৪৬টি নন-লাইফ বীমা কোম্পানি রয়েছে। এই বিপুল সংখ্যক প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে লাখ লাখ মানুষ তাদের জীবন, পরিবার ও ভবিষ্যৎ আর্থিক নিরাপত্তার জন্য বীমা পলিসি গ্রহণ করেন। জীবন বীমার কাজ ব্যাংকের মতো অর্থ লেনদেন করা নয়। এর মূল উদ্দেশ্য হলো একজন মানুষের মৃত্যু বা অন্যান্য নির্ধারিত ঝুঁকির কারণে তার পরিবারের ওপর যে আর্থিক চাপ তৈরি হতে পারে, তা কমানো। একজন উপার্জনক্ষম মানুষের আকস্মিক মৃত্যু হলে তার পরিবারের সামনে একসঙ্গে অনেকগুলো প্রশ্ন দাঁড়ায় দৈনন্দিন খরচ কীভাবে চলবে, সন্তানের পড়াশোনা কীভাবে হবে, চিকিৎসা বা অন্যান্য ঋণের বোঝা কীভাবে সামলানো হবে, ভবিষ্যতের আর্থিক পরিকল্পনা কীভাবে বাস্তবায়িত হবে। জীবন বীমা এসব ঝুঁকির বিরুদ্ধে একটি আর্থিক সুরক্ষা তৈরি করতে পারে। কিন্তু এই সুরক্ষা তখনই কার্যকর হয়, যখন বৈধ দাবি যথাসময়ে পরিশোধ করা হয়।

দাবি নিষ্পত্তিতে দীর্ঘসূত্রতা: বীমা খাতের আস্থার সংকট: বীমা উন্নয়ন ও নিয়ন্ত্রণ কর্তৃপক্ষের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৬ সালের মার্চ পর্যন্ত জীবন ও নন-লাইফ মিলিয়ে মোট ১০ হাজার ৬১১ কোটি টাকার দাবি উত্থাপিত হয়েছিল। এর মধ্যে ৭ হাজার ৭৭৯ কোটি টাকা, অর্থাৎ ৭৩ দশমিক ৩১ শতাংশ দাবি তখনও অনিষ্পন্ন ছিল। জীবন বীমার ক্ষেত্রে মোট দাবির পরিমাণ ছিল ৬ হাজার ৮১৩ কোটি টাকা। এর মধ্যে ৪ হাজার ৪১০ কোটি টাকা বা ৬৪ দশমিক ৭৩ শতাংশ দাবি অনিষ্পন্ন ছিল। অর্থাৎ জীবন বীমায় প্রতি ১০০ টাকার দাবির মধ্যে প্রায় ৬৫ টাকার দাবি মার্চ ২০২৬ পর্যন্ত নিষ্পত্তি হয়নি। এই পরিসংখ্যান শুধু একটি আর্থিক হিসাব নয়; এর সঙ্গে মানুষের আস্থা ও পরিবারের নিরাপত্তা সরাসরি জড়িত। একজন ব্যক্তি বছরের পর বছর প্রিমিয়াম দেওয়ার পর যখন প্রয়োজনের সময় বীমা দাবি পান না বা দীর্ঘদিন অপেক্ষা করতে হয়, তখন তার কাছে বীমার মূল উদ্দেশ্যই প্রশ্নবিদ্ধ হয়ে ওঠে।

খেলাপি ঋণ বা অনিষ্পন্ন দাবি কোনোটিই দুর্নীতির হার নয়: এখানে আরেকটি বিষয় পরিষ্কার করা জরুরি। ব্যাংকিং খাতে খেলাপি ঋণের হার ৩২ দশমিক ৭৮ শতাংশ এটি দুর্নীতির হার নয়। এটি মোট ঋণের মধ্যে শ্রেণিকৃত ঋণের অনুপাত। একইভাবে জীবন বীমায় অনিষ্পন্ন দাবির হার ৬৪ দশমিক ৭৩ শতাংশ এটিও দুর্নীতির হার নয়। এটি মোট দাবির মধ্যে অনিষ্পন্ন দাবির অনুপাত। তাই গণমাধ্যমে বা জনপরিসরে আলোচনার সময় পরিসংখ্যানকে তার প্রকৃত অর্থেই উপস্থাপন করা উচিত। এতে আলোচনার বিশ্বাসযোগ্যতা বাড়ে এবং প্রকৃত সমস্যাগুলো চিহ্নিত করাও সহজ হয়।

ব্যাংক ও বীমা দুটি খাতকে একসঙ্গে দেখার কারণ: একজন মানুষ ব্যাংকে টাকা রাখেন, ব্যবসার জন্য ঋণ নেন, বেতন পান, অর্থ পাঠান ও গ্রহণ করেন। কিন্তু একই মানুষ অসুস্থ হতে পারেন, দুর্ঘটনার শিকার হতে পারেন কিংবা অকালে মারা যেতে পারেন। তার আয়ের ওপর নির্ভরশীল পরিবারের ভবিষ্যৎ তখন অনিশ্চিত হয়ে পড়তে পারে। ব্যাংক মানুষের অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডকে সচল রাখে; কিন্তু ব্যক্তিগত জীবনের মৃত্যু, আয় বন্ধ হয়ে যাওয়া কিংবা পরিবারের আর্থিক বিপর্যয়ের ঝুঁকি ব্যাংক সরাসরি মোকাবিলা করে না। এখানেই জীবন বীমার গুরুত্ব। একজন উদ্যোক্তা ব্যাংক থেকে ঋণ নিয়ে ব্যবসা শুরু করলেন। ব্যবসা বাড়ালেন, কর্মসংস্থান তৈরি করলেন, কর দিলেন এবং অর্থনীতিতে অবদান রাখলেন। কিন্তু হঠাৎ তার মৃত্যু হলে তার পরিবার যদি ঋণ, চিকিৎসা ব্যয়, সন্তানের শিক্ষা ও দৈনন্দিন খরচ সামলাতে না পারে, তাহলে তার তৈরি আর্থিক সক্ষমতা বড় ধরনের ধাক্কার মুখে পড়তে পারে। জীবন বীমা এ ধরনের পরিস্থিতিতে পরিবারকে একটি আর্থিক সুরক্ষা দিতে পারে। সুতরাং সহজ ভাষায় বলা যায় ব্যাংক অর্থনীতিকে ফাইন্যান্স করে, আর বীমা অর্থনীতির ঝুঁকিকে প্রোটেক্ট করে।

একটি শক্তিশালী অর্থনীতির জন্য এই দুই ভূমিকারই প্রয়োজন।

এখন কী করা দরকার

বাংলাদেশের ব্যাংকিং খাতকে শক্তিশালী করতে প্রথমেই খেলাপি ঋণ পুনরুদ্ধারে কার্যকর ব্যবস্থা নিতে হবে। একই সঙ্গে ঋণ অনুমোদন ও বিতরণে রাজনৈতিক প্রভাব, স্বার্থের সংঘাত এবং অনিয়ম বন্ধ করতে হবে। ব্যাংকের পরিচালনা পর্ষদ ও ব্যবস্থাপনায় জবাবদিহি নিশ্চিত করা এবং ব্যাংকের প্রকৃত আর্থিক অবস্থার স্বচ্ছ প্রকাশও জরুরি। অর্থপাচারের অভিযোগ তদন্ত এবং পাচার হওয়া অর্থ ফেরত আনার ক্ষেত্রেও আন্তর্জাতিক সহযোগিতা আরও জোরদার করতে হবে। অন্যদিকে জীবন বীমা খাতের ক্ষেত্রে বৈধ দাবি দ্রুত নিষ্পত্তি হওয়া সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়গুলোর একটি। দুর্বল কোম্পানিগুলোর আর্থিক পুনর্গঠন, গ্রাহকের অর্থের নিরাপত্তা, বিনিয়োগের স্বচ্ছতা এবং শক্তিশালী করপোরেট গভর্ন্যান্স নিশ্চিত করতে হবে। পাশাপাশি ডিজিটাল দাবি ব্যবস্থাপনা চালু করে গ্রাহককে তার পলিসি ও দাবির অগ্রগতি সম্পর্কে নিয়মিত তথ্য দেওয়া যেতে পারে। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো, ব্যাংক ও বীমা উভয় খাতেই নিয়ন্ত্রক সংস্থার নজরদারি হতে হবে কার্যকর, স্বচ্ছ ও জবাবদিহিমূলক।

আস্থাই হতে পারে সংস্কারের মূল ভিত্তি বাংলাদেশের অর্থনীতিকে শক্তিশালী করতে শুধু ব্যাংক উদ্ধার বা শুধু বীমা শিল্পের সংস্কার যথেষ্ট নয়। প্রয়োজন একটি সমন্বিত Financial Sector Reform যেখানে ব্যাংকিং ও বীমা খাতকে আলাদা আলাদা প্রতিষ্ঠান হিসেবে নয়, বরং একটি বৃহত্তর আর্থিক ব্যবস্থার অংশ হিসেবে বিবেচনা করা হবে।

ব্যাংকিং খাতে আস্থা ফিরিয়ে আনতে হবে। বীমায় বৈধ দাবি দ্রুত পরিশোধের সংস্কৃতি প্রতিষ্ঠা করতে হবে। গ্রাহকের অর্থের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে হবে। একই সঙ্গে আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোর পরিচালনায় স্বচ্ছতা, দক্ষতা ও জবাবদিহি নিশ্চিত করতে হবে। কারণ একটি দেশের অর্থনীতি শুধু অর্থের ওপর দাঁড়িয়ে থাকে না। অর্থনীতির প্রকৃত শক্তি তৈরি হয় মানুষের আস্থা, বিনিয়োগের নিরাপত্তা, ঝুঁকি মোকাবিলার সক্ষমতা এবং ভবিষ্যৎ সম্পর্কে নিশ্চয়তা থেকে।

সেই অর্থে শক্তিশালী ব্যাংকিং ব্যবস্থা অর্থনীতিকে অর্থায়ন করে, আর শক্তিশালী বীমা ব্যবস্থা পরিবার ও অর্থনীতিকে ঝুঁকি থেকে সুরক্ষা দেয়। তাই বাংলাদেশের জন্য লক্ষ্য হওয়া উচিত Strong Banking. Trusted Insurance. Protected Families. Stable Economy. এটাই হতে পারে একটি শক্তিশালী, স্থিতিশীল ও জনবান্ধব আর্থিক ব্যবস্থার ভিত্তি।


মোঃ জসিম উদ্দিন

Founder, Project Family Happiness

Branch Manager

Sonali life Insurance PLC